সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী ভোলাগঞ্জ রোপওয়ের সংরক্ষিত (বাঙ্কার) এলাকায় মাটি খুঁড়ে পাথর উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। ফলে বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ধারক এলাকাটি। যত্র-তত্র পাথর উত্তোলনের ফলে এরই মধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে স্থাপনাটির বেশ কিছু এলাকা। হেলে পড়েছে রোপওয়ের কয়েকটি খুঁটিও। পাশাপাশি সংরক্ষিত প্লান্ট এলাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও লোহা লক্করও খোয়া যাচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পাথর পরিবহনে স্থল কিংবা জলযানের বিকল্প হিসেবে ভোলাগঞ্জ থেকে সুনামগঞ্জের ছাতকে রোপওয়ে স্থাপন হয় ১৯৬৪ সালে। এ রোপওয়েতে ১১৯টি খুঁটি রয়েছে। ভোলাগঞ্জ রোপওয়ের সংরক্ষিত এলাকার লোডিং স্টেশনকে ‘বাংকার’ বলে ডাকা হয়। অবাধে পাথর তোলার কারণে প্রায় ৩৫৯ একর আয়াতনের ওই এলাকাটি ধ্বংসের পথে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাঙ্কারে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। প্রতিটি গর্তে ৩০-৪০ জন করে শ্রমিক। বেলচা, শাবলের সাহায্যে মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে শ্রমিকেরা বের করছে পাথর। গর্তের পাশেই স্তুপ করে রাখা হচ্ছে এসব পাথর। পরে ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে উত্তোলনকৃত পাথর নেয়া হয় বিভিন্ন ক্রাশার মিলে।
বাঙ্কার থেকে পাথর তোলায় প্লান্ট এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ ভূমি ধলাই নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। বর্তমানে প্লান্ট এলাকার প্রধান চুল্লী পাওয়ার হাউস, আবাসিক ভবন, মসজিদ, স্কুলসহ বিভিন্ন স্থাপনা মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান। এর পাশেই রোপওয়ে বাঙ্কার। অবাধে পাথর উত্তোলনের ফলে এলাকাটি এখন ক্ষতবিক্ষত। এলাকাবাসীর অভিযোগ- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের যোগসাজশে বাঙ্কার খুঁড়ে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। রাতের আঁধারে পাশের ধলাই নদী থেকেও চলে বালু ও পাথর উত্তোলন। উপজেলা প্রশাসন ও আইন রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় লুটপাটকারীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, রোপওয়ের আশপাশে বিজিবির তিনটি ক্যাম্প রয়েছে। বিজিবির প্রত্যক্ষ মদদেই বাঙ্কার খুঁড়ে বালু-পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। অবাধে পাথর তোলার কারণে পর্যটন এলাকার চেহারা এখন বিবর্ণ। রোপওয়ে বাঙ্কার প্রায় ধ্বংসের পথে। লুটপাটকারীরা সংঘবদ্ধ। তাই প্রতিবাদ করার সাহস করে না কেউ।
এ বিষয়ে জানতে বিজিবির কালাসাদক কোম্পানি কমান্ডারের সরকারি নাম্বারে কল দিলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কলটি কেটে দেন।
এদিকে, শুক্রবার বিকেলে ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি, রোপওয়ে বাঙ্কার এবং পর্যটন এলাকা পরিদর্শন করেছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার আবু আহমদ ছিদ্দিকী। এসময় তিনি রোপওয়ের সংরক্ষিত এলাকার নিচে রক্ষিত পাথর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান। পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার দেবজিৎ সিংহ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসাইন মো. আল-জুনায়েদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ডিডি মো. ফেরদৌস আনোয়ারসহ অধস্তন কর্মকর্তারাও তার সাথে ছিলেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবিদা সুলতানা বলেন, বিভাগীয় কমিশনার পাথর কোয়ারি, পর্যটন এলাকা ও রোপওয়েটি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হন। রোপওয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগের কথাও জানান। পাথরখেকো চক্রের তৎপরতা বন্ধে পুলিশসহ আইন রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া, পাথর খনি থেকে পাথর উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের একটি টিম কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান করছে বলেও জানান ইউএনও।
