স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বিশেষ মতবিনিময়
সিলেটের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ। সুরমা-কুশিয়ারার পলিবিধৌত এই জনপদের লাখো মানুষের নিত্যদিনের লড়াই যেমন প্রকৃতির সাথে, তেমনি লড়তে হয় নাগরিক মৌলিক অধিকারের সাথেও। আর এই মৌলিক অধিকারের মধ্যে সবচেয়ে জরুরী যে খাতটি দীর্ঘদিন ধরে একরকম ধুঁকছিল, সেই খাত হলো স্বাস্থ্যসেবা। দূরত্বের কারণে হুট করে সিলেট শহরে এসে চিকিৎসা নেয়া এখানকার সাধারণ মানুষের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সময়সাপেক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কানাইঘাট এবং জকিগঞ্জ উপজেলায় দুটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। ৫০ শয্যায় উন্নীত করণের জন্য অবকাঠামো তৈরি করা হলেও অনুমোদন না থাকায় কারণে এখনও ৩১ শয্যায় সেবাদান পরিচালনা করা হচ্ছে হাসপাতাল দুটিতে। পাশাপাশি অপ্রতুল জনবলসহ নানা সংকট বিদ্যমান। একইভাবে গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ঘরের কাছের চিকিৎসার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর চলছেও ধুঁকে ধুঁকে।
তবে আশার কথা হলো, স্থবির হয়ে থাকা এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে তার সমাধানের উপায় ও করণীয় সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করতে আয়োজন করা হয়েছে মতবিনিময় সভার। সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান-এর বিশেষ আহ্বানে গতকাল সোমবার সকালে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরীর কার্যালয়ে বসেছিল এক বিশেষ মতবিনিময় সভা। উদ্দেশ্য কাগজে-কলমে সমস্যার তালিকা করা নয়, বরং মাঠপর্যায়ের চিকিৎসাসেবার চিত্র বদলে দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে এই সভায় বসেছিলেন সিলেটের চিকিৎসা খাতের নীতিনির্ধারকেরা।
সভায় কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের শূন্যপদ, জনবল সংকট, কিংবা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ যেভাবে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তা উঠে আসে আলোচনায়। একই সাথে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং গ্রামীণ জনপদের মানুষের ভোগান্তি কমাতে সভায় বেশ কিছু জরুরি বিষয় নিয়েও বিশদ আলোচনা করা হয়।
দুই উপজেলার হাসপাতালে শুধু ভবন নয়, অনুমোদিত ৫০ শয্যায় পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয় এই সভা থেকে। এছাড়া চিকিৎসকের শূন্যপদ পূরণসহ জনবল সংকট নিরসন, স্বাস্থ্য উপকরণ ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও তাগিদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে রোগীদের জরুরি যাতায়াতের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা, লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি এড়াতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া এবং গ্রামীণ জনগণের জন্য ‘কমিউনিটি ক্লিনিক’ সমূহের সেবা গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আখলাক আহমদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুল আলম, সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এবং ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত (শংকর)।
পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ মুনতাসির আলী, সিলেট জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাওলানা মুখলিছুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা দিলওয়ার হোসাইন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দুই উপজেলার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, ‘এই সভায় উঠে আসা স্বাস্থ্যসেবার সমস্যাগুলো সমাধান দ্রুততার সাথে করা গেলে কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের অবহেলিত স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। সুরমা-কুশিয়ারাপাড়ের এই দুই উপজেলার মানুষ ঘরে বসেই পাবেন আধুনিক চিকিৎসাসেবা।’
এ বিষয়ে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ‘আমার নির্বাচনী আসনের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অন্যতম একটি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আমি শুরু থেকেই কাজ করে যাচ্ছি। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পরিদর্শন করেছি। তখন আমার কাছে হাসপাতালগুলোতে বিভিন্ন ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। তাৎক্ষণিক দুই হাসপাতালেই কয়েকজন চিকিৎসক পদায়ন করা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলা দুটির সার্বিক স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাসমূহ চিহ্নিত করে তা সমাধানের উপায় ও করণীয় নিয়ে সিলেটের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের সাথে বসেছিলাম। সভায় বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে দ্রুতই কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ অঞ্চলের অবহেলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে এবং সাধারণ মানুষ উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাবেন বলে আশাবাদি আমি।’
