বিল্ডিং কোড অমান্য, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ও নাগরিক অসচেতনতায় বাড়ছে সংকট; কঠোর অবস্থানে সিসিক
নগর উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভবন, কিন্তু মানা হচ্ছে না বিল্ডিং কোড। কোথাও ভবনের জন্য রাখা হয়নি প্রয়োজনীয় জায়গা, আবার কোথাও সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য সরাসরি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে ড্রেন কিংবা ছড়ায়। এর ফলে একদিকে যেমন বাড়ছে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
সিলেট নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাদামবাগিচা এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে এমন চিত্রই দেখতে পান সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। সোমবার (২১ জুলাই) সকালে পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে নগরবাসীকে এখন এর খেসারত দিতে হচ্ছে।
পরিদর্শনে দেখা যায়, অনেক ভবন সরকারি বিল্ডিং কোড অনুসরণ না করেই নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও পানি চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রাখা হয়নি, আবার অনেক ভবনের সেপটিক ট্যাংকের লাইন সরাসরি ড্রেন ও ছড়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
সিসিক প্রশাসকের ভাষ্য, এ ধরনের অনিয়ম শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে না, বরং পুরো নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। ড্রেনে মানববর্জ্য যাওয়ার ফলে দুর্গন্ধ ছড়ায়, রোগজীবাণুর বিস্তার ঘটে এবং বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।
আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, সেপটিক ট্যাংকের লাইন কোনো অবস্থাতেই ড্রেন বা ছড়ার সঙ্গে সংযুক্ত করা যাবে না। বাড়ি নির্মাণের সময় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ছড়া ও ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে হবে। কারণ একটি পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষায়, “সামান্য সচেতনতাই আমাদের প্রিয় নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত ও বাসযোগ্য করে তুলতে পারে। পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত নগর গড়তে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
পরিদর্শন শেষে সিসিক প্রশাসক নগরবাসীকে আগামী তিন মাসের মধ্যে ড্রেন ও ছড়ার সঙ্গে সংযুক্ত সব সেপটিক ট্যাংকের লাইন বিচ্ছিন্ন করে স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনিয়ম দূর না হলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যার সমাধান শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়। বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন ও ছড়া দখলমুক্ত রাখা এবং নাগরিকদের সচেতন আচরণ—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত হলেই একটি স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব।
সিসিকের সাম্প্রতিক অভিযান ও কঠোর অবস্থান সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রশাসনের ধারাবাহিক তদারকির পাশাপাশি নগরবাসীর দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের ওপর।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান
পরিদর্শনের পাশাপাশি বাদামবাগিচা এলাকায় সিসিকের উদ্যোগে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব।
ড্রেন ও ছড়ায় সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য ফেলার দায়ে কয়েকজনকে জরিমানা করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ভবনের মালিকদের সতর্ক করা হয়।
বিশ্বজিত দেব জানান, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ড্রেন ও ছড়ার সঙ্গে অবৈধভাবে সংযুক্ত সেপটিক ট্যাংকের লাইন চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষা, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
