সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যা মামলায় প্রধান আসামি তৎকালীন ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়ার মৃত্যুদণ্ড এবং কনস্টেবল হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুনসী আব্দুল মজিদ এ রায় দেন। রায়ে অপর তিন আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন এসআই হাসান উদ্দিন, পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহি ও এসআই আকবরের আত্মীয় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সংবাদকর্মী আবদুল্লাহ আল নোমান। রায়ের সময় হাজতে থাকা একমাত্র আসামি আশেক এলাহি শুধু আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন বলেন, মামলায় ৬৯ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬১ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালতে আপিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পিপি জানান, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে আকবর হোসেন, হারুন অর রশিদ ও টিটু চন্দ্র দাসকে এক লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সাত বছর কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
আসামি আশেক এলাহী ও হাসানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন শামীম বলেন, ‘আশেক এলাহী গত ছয় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে হাসান প্রায় দেড় বছর কারাভোগ করেছেন। আদালত তাঁদের তথ্য লোপাটের অভিযোগে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। আশা করছি, হাসান আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করবেন। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।’
মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে তুলে নিয়ে রায়হান আহমদকে নির্যাতন করা হয়। পরের দিন তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে রায়হানের স্ত্রীর করা মামলার পর অভিযোগের সত্যতা পায় সিলেট মহানগর পুলিশের একটি অনুসন্ধান কমিটি। পরে ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা এসআই আকবর হোসেনসহ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর পুলিশি হেফাজত থেকে কনস্টেবল হারুনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২০২১ সালের ৫ মে আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয় পিবিআই। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর জেলহাজতে ছিলেন। তবে প্রথম থেকেই পলাতক ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান।
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মনের শান্তি হবে না। আকবরের ফাঁসির রায় হয়েছে; কিন্তু তিনি তো পালিয়ে গেছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র একজন হাজতে রয়েছেন। বাকিরা ধাপে ধাপে আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়েছেন।
সর্বশেষ গত বছরের আগস্টে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান আকবর হোসেন। এরপর ১১ আগস্ট সিলেট কারাগার থেকে ছাড়া পান তিনি। ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ পিটিশন ফর লিভ টু আপিল দায়ের করে। শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার জজ উচ্চ আদালতের আদেশ স্থগিত করেন। পাশাপাশি আকবর হোসেনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন; কিন্তু আদালতে আর আত্মসমর্পণ করেননি আকবর।
রায়হানের মা সালমা বেগমের অভিযোগ ছিল আকবর হোসেন ভূঁইয়া জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরই ভারতে পালিয়ে গেছেন। আশেক এলাহি ছাড়া বাকি আসামিরাও পর্যায়ক্রমে জামিন নিয়ে কারামুক্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক।
রায়ে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নিহত রায়হানের মা সালমা বেগম। তিনি বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মনের শান্তি হবে না। আকবরের ফাঁসির রায় হয়েছে; কিন্তু তিনি তো পালিয়ে গেছেন। দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র একজন হাজতে রয়েছেন। বাকিরা ধাপে ধাপে আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়েছেন। তাঁরা যেখানেই থাকুক, তাঁদের আটক করতে দেশবাসীর কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন রায়হানের মা।
