বুধবার , ১৩ মে ২০২৬, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, রাত ১:২৫

প্ল্যাটফর্মের সেই ‘অচেনা’ শিশু স্বপ্নার এক রূপকথার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক ::
মে ১৩, ২০২৬ ৮:৪৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

চৌদ্দ বছর আগের কথা। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের গিজগিজে ভিড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল চার বছরের এক শিশু। নিজের নামটুকুও তখন স্পষ্টভাবে বলতে শেখেনি সে। চোখেমুখে ছিল হারানোর তীব্র আতঙ্ক আর এক অজানা ভবিষ্যতের ভয়। সেই আশ্রয়হীন, পরিবারহীন শিশুটির নাম ছিল স্বপ্না আক্তার। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর সেই আতঙ্কিত চোখ আজ আনন্দের অশ্রুতে ভেজা।

কারণ বুধবার (১৩ মে) সিলেটের শিবগঞ্জ লামাপাড়ার সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্বপ্নার নতুন জীবনের সূচনা হয়েছে।

২০১২ সালে সিলেট স্টেশন থেকে উদ্ধারের পর স্বপ্নার ঠাঁই হয়েছিল সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ‘সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে’। জানা যায়, তার বাবা-মা দুজনেই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। পরিবারহীন সেই শিশুটিকে পরম মমতায় আগলে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে শুধু অন্ন-বস্ত্রের আশ্রয়ই নয়, তাকে দেওয়া হয় শিক্ষার সুযোগ। নিজের একাগ্রতায় স্বপ্না ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় তার সম্মতিতেই বিয়ের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। পাত্র সিলেটেরই এক যুবক, পেশায় ইলেকট্রিক ঠিকাদার। বুধবার দুপুরে আয়োজিত এই বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। সাজসজ্জা থেকে শুরু করে আপ্যায়ন—সবকিছুই ছিল একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের আদুরে মেয়ের বিয়ের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ।

বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস. এম. মোক্তার হোসেন বলেন, “স্বপ্নার কোনো অভিভাবক নেই, তাই আমরাই তার পরিবার হয়ে দাঁড়িয়েছি। স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। কোনো অভিভাবক না থাকায় এবং তার সম্মতি নিয়েই আমরা বিয়ের আয়োজন করেছি। আমরা চেয়েছি তার ভবিষ্যৎ যেন সুন্দর ও নিরাপদ হয়”।

স্বপ্নার এই নতুন যাত্রায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। বিয়ের খরচ ও তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা তার নামে এফডিআর (Fixed Deposit Receipt) করে রাখা হবে। স্থানীয় এক সহৃদয় ব্যক্তি দিয়েছেন ঘরের সব আসবাবপত্র, আর একটি মিষ্টির দোকান থেকে উপহার হিসেবে এসেছে ১০০ কাপ দই।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ তার বিয়ের আয়োজনের মধ্য দিয়ে তার ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি হলো”।

তিনি নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা করেন।

২০১২ সাল থেকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র বর্তমানে দেশের ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বপ্নার মতো হাজারো পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে আসছে। স্বপ্নার এই রূপকথার মতো গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা আর মানবিকতা থাকলে অন্ধকার থেকেও আলোর পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

চৌদ্দ বছর আগে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে হারিয়ে যাওয়া সেই শিশুটি আজ এক নতুন সংসারের দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। স্বপ্নার এই যাত্রা কেবল একজন তরুণীর বিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ববোধ আর সমাজসেবার সার্থকতা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।