সিলেট নগরের রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকায় ব্যবসায়ী এম আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগম হত্যার ঘটনায় প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর মামলা হয়েছে। নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেন। তবে মামলার এজাহারে আটক বাবুলের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
মামলার এজাহারে সেলিনা সুলতানা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য ধারাবাহিক হুমকির জেরে ‘পেশাদার ভাড়াটে খুনিদের’ ব্যবহার করে তার বাবা-মা ও গৃহপরিচারিকাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, রায়নগর এলাকার সম্পত্তি এবং পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমির মালিকানা নিয়ে তার বাবা আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ নিয়ে একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
সেলিনার অভিযোগ, এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময় তার বাবা ও তাকে হুমকি দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি বিকেলে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকজন তাদের পৈতৃক বাসায় গিয়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন। এ সময় তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় তিনি কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে মামলা প্রত্যাহারের জন্য আব্দুস সাত্তার ও মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে আবারও চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তৌহিদুল ইসলামকে মারধর এবং আব্দুস সাত্তারকে আঘাত করা হয়। এ ঘটনায় পরে আদালতে মামলা করা হয়।
সেলিনা অভিযোগ করেন, এসব মামলা চলমান থাকার মধ্যেও তার বাবাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়া অব্যাহত ছিল। এমনকি তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকেও প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার মিতালী-১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।
ঘটনার পর সিলেট মহানগর পুলিশ জানায়, বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল এবং দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বাইরে গড়িয়ে আসছিল। পরে পুলিশ, পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটন ও জড়িতদের শনাক্ত করতে বিশেষ টিমও গঠন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর বিকেলে বাবুল মিয়া নামে একজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। গৃহপরিচারিকা তাহমিনার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন বলেও পুলিশ দাবি করে।
তবে পুলিশের এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহত আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সেলিনা সুলতানা। তার দাবি, হত্যাকাণ্ডটি শুধুমাত্র গৃহপরিচারিকার আচরণকে কেন্দ্র করে ঘটেছে—এমনটি তিনি মনে করেন না। বরং দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ ও মামলা প্রত্যাহারের জন্য দেওয়া হুমকির বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এজাহারে সেলিনা আরও উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের আগে পর্যন্ত তার বাবা সম্পত্তিসংক্রান্ত মামলাগুলো নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, সাধারণ ডায়েরির কপি ও বিভিন্ন দলিল নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।
বিশেষ করে ‘১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবালা দলিল’সহ ভূমিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করে সেলিনা দাবি করেন, এসব নথি নিয়ে বিরোধের কারণেও তার বাবাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
তার অভিযোগ, দীর্ঘদিনের এসব বিরোধ, মামলা এবং হুমকির ধারাবাহিকতায় তার বাবা, মা ও গৃহপরিচারিকাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তাই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির বলেন, নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে নিহত আব্দুস সাত্তারের বিরোধের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
