২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকলেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপন মোবাইল নম্বর, স্যাটেলাইট ফোন এবং বিশেষ ব্যাকআপ ইন্টারনেট ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক দল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালে সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ থাকলেও গণভবনে বিশেষ ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট সচল রাখা হয়। ফরেনসিক তদন্তে গণভবনের ছাদে স্থাপিত একটি টাওয়ার ডাম্পেরও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের (বর্তমানে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট) বিশেষ সংযোগ ব্যবহার করে গণভবনে উচ্চগতির ইন্টারনেট চালু রাখা হয়েছিল।
তদন্তে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট আন্দোলনের একদফা দাবির ঘোষণার পর শেখ হাসিনার ব্যবহৃত ফোন থেকে অন্তত ৭০টি নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। এর মধ্যে ১১টি নম্বরের সঙ্গে থাকা নাম, ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে তদন্তকারী দল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪ আগস্ট নিজের নিয়মিত ব্যবহৃত ফোন নম্বরের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে শেখ হাসিনা যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্যাটেলাইট ফোন এবং গণভবনের কর্মীদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ব্যবহার শুরু করেন। ওই স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমেই ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাময়িক আশ্রয়ের আবেদন জানান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ভারতের সম্মতি পাওয়ার পর বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টারে করে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা কুর্মিটোলা এয়ার মুভমেন্টে যান। সেখানে ভিআইপি লাউঞ্জে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এর একটি ছিল বিদেশে অবস্থানরত সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে নিবন্ধিত একটি নম্বরে, যা সে সময় দেশে সক্রিয় ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অপর ফোনালাপটি তিনি হেলিকপ্টার উড্ডয়নের এক মিনিট আগে করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, ১ আগস্ট থেকেই শেখ হাসিনা তার নিকটাত্মীয় ও স্বজনদের গোপনে দেশ ছাড়ার বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। তবে ওই এসএমএসগুলোর ফরেনসিক বিশ্লেষণ এখনও সম্পন্ন হয়নি।
এদিকে, এসব যোগাযোগসংক্রান্ত তথ্য মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে। তদন্তে জানা যায়, জলসিঁড়িতে নিজের বাসভবনে তিনি একটি ব্যক্তিগত সার্ভার সিস্টেম স্থাপন করেছিলেন।
এ বিষয়ে তানভীর হাসান জোহা বলেন, ওই বাসভবনে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দ নিয়ে সেখানে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, যাকে তিনি ‘ডিজিটাল আয়নাঘর’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, এসব তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডিজিটাল ফরেনসিক দলের তদন্ত এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
